৭ অক্টোবর আটক ফিলিস্তিনিদের জন্য মৃত্যুদণ্ড ও জনসমক্ষে বিচার আইন পাস করল ইসরায়েল

৭ অক্টোবর আটক ফিলিস্তিনিদের জন্য মৃত্যুদণ্ড ও জনসমক্ষে বিচার আইন পাস করল ইসরায়েল
ছবির ক্যাপশান, ইসরায়েলি সংসদ নেসেট | ছবি: সংগৃহীত

ইসরায়েলি সংসদে (নেসেট) ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সুযোগ রেখে বিশেষ একটি আদালত গঠনের বিতর্কিত বিল পাস হয়েছে। সোমবার রাতে অনুষ্ঠিত ভোটে ১২০ আসনের সংসদে বিলটি ৯৩–০ ভোটে অনুমোদিত হয়। ভোটে অংশ না নেওয়া বা বিরত থাকা সংসদ সদস্য ছিলেন ২৭ জন।

বিলে বলা হয়েছে, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বে ইসরায়েলে সংঘটিত হামলার ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে আটক ফিলিস্তিনিদের বিচার করার জন্য বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হবে। এই ট্রাইব্যুনাল মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার ক্ষমতাও পাবে। বিষয়টি ঘিরে দেশ-বিদেশে ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

 

মানবাধিকার সংস্থা ও আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই আইন ন্যায্য বিচার ব্যবস্থার মৌলিক নীতিকে দুর্বল করে দিতে পারে। তাদের মতে, এতে বিচার প্রক্রিয়া আগেই পক্ষপাতদুষ্ট হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে এবং অভিযুক্তদের অধিকার ক্ষুণ্ণ হতে পারে।

 

আইনজীবী মুনা হাদ্দাদ, যিনি ইসরায়েলের আরব সংখ্যালঘুদের অধিকার রক্ষা বিষয়ক সংস্থা “আদালাহ”-এর সঙ্গে যুক্ত, বলেন-এই আইন ইচ্ছাকৃতভাবে ন্যায্য বিচারের জন্য প্রয়োজনীয় সুরক্ষা কমিয়ে দিয়েছে, যাতে বৃহৎ সংখ্যায় ফিলিস্তিনিদের দোষী সাব্যস্ত করা সহজ হয়। তার ভাষায়, বিচারিক প্রমাণের স্বাভাবিক মানদণ্ড শিথিল করে এমনকি চাপ বা নির্যাতনের মাধ্যমে পাওয়া তথ্যকেও প্রমাণ হিসেবে গ্রহণের সুযোগ রাখা হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের পরিপন্থী।

 

তিনি আরও বলেন, আদালত কার্যক্রমের গুরুত্বপূর্ণ অংশ যেমন শুনানি, রায় এবং শাস্তি সরাসরি প্রচারের বিধান রাখা হয়েছে, যা বিচারকে কার্যত জনসমক্ষে “প্রদর্শনীমূলক বিচার” বা জনমতের বিচার বানিয়ে ফেলতে পারে। এতে অভিযুক্ত ব্যক্তির নির্দোষ থাকার অধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

 

আইন অনুযায়ী, বিচার কার্যক্রমের নির্দিষ্ট অংশ একটি আলাদা অনলাইন প্ল্যাটফর্মে সম্প্রচার করা হবে। সমালোচকদের মতে, এতে বিচার শুরুর আগেই জনমত তৈরি হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যা নিরপেক্ষ বিচার ব্যবস্থার জন্য হুমকি।

 

বর্তমানে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ আনুমানিক ২০০ থেকে ৩০০ ফিলিস্তিনিকে আটক রেখেছে, যাদের অনেকের বিরুদ্ধে এখনো আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করা হয়নি। এদের মধ্যে কেউ কেউ ৭ অক্টোবরের হামলার সময় আটক হয়েছেন বলেও দাবি করা হয়।

 

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলায় ইসরায়েলি সূত্র অনুযায়ী ১ হাজার ১৩৯ জন নিহত হন, যাদের বেশিরভাগই বেসামরিক নাগরিক। ওই হামলায় প্রায় ২৪০ জনকে আটক করে নিয়ে যাওয়া হয়। এর পর থেকে গাজায় ইসরায়েলের ব্যাপক সামরিক অভিযান চলছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা ও পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনের ভিত্তিতে জানা যায়, এই অভিযানে এখন পর্যন্ত গাজায় বিপুল সংখ্যক ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন এবং অঞ্চলটি মারাত্মক ধ্বংসের মুখে পড়েছে।

 

মানবাধিকার সংস্থাগুলো বলছে, এই নতুন আইন কার্যকর হলে বিচার প্রক্রিয়া আরও কঠোর ও একপাক্ষিক হয়ে পড়তে পারে এবং মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঝুঁকি বৃদ্ধি পেতে পারে। তারা এটিকে ন্যায্য বিচার ব্যবস্থার জন্য বড় হুমকি হিসেবে দেখছে।

ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাস এই আইনকে ইসরায়েলের যুদ্ধাপরাধ আড়াল করার একটি রাজনৈতিক পদক্ষেপ হিসেবে অভিহিত করেছে। তাদের মতে, এটি প্রতিশোধমূলক নীতির অংশ।

 

অন্যদিকে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাতের প্রেক্ষাপটে বিচার ও মানবাধিকারের প্রশ্ন দিন দিন আরও জটিল হয়ে উঠছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের বিষয়ে তদন্ত চালাচ্ছে এবং শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও জারি হয়েছে বলে আন্তর্জাতিক সূত্রে জানা যায়।

 

একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগ সংক্রান্ত মামলাও চলমান রয়েছে। তবে ইসরায়েল সরকার এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলছে, তারা আত্মরক্ষার অধিকার প্রয়োগ করছে।


সম্পর্কিত নিউজ