‘প্রজেক্ট ফ্রিডমে’ মার্কিন বিমানকে আকাশসীমা দেয়নি সৌদি আরব ও কুয়েত

‘প্রজেক্ট ফ্রিডমে’ মার্কিন বিমানকে আকাশসীমা দেয়নি সৌদি আরব ও কুয়েত
ছবির ক্যাপশান, জাগরণ ছবি

হরমুজ প্রণালিতে আটকে পড়া বাণিজ্যিক জাহাজ পাহারায় যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পিত সামরিক অভিযান ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ স্থগিতের পেছনে সৌদি আরব ও কুয়েতের আপত্তি বড় ভূমিকা রেখেছে বলে জানিয়েছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম এনবিসি নিউজ। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সৌদি আরব তাদের আকাশসীমা ও সামরিক ঘাঁটি ব্যবহার করতে না দেওয়ায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অভিযানটি সাময়িকভাবে থামিয়ে দেন। এনবিসির তথ্য উদ্ধৃত করে দ্য গার্ডিয়ান ও দ্য মিডিয়া লাইনও এ খবর প্রকাশ করেছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, রিয়াদের দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটি ব্যবহার কিংবা সৌদি আকাশসীমা দিয়ে মার্কিন সামরিক বিমান চালানোর অনুমতি দেয়নি সৌদি আরব। দুই মার্কিন কর্মকর্তার বরাতে এনবিসি জানিয়েছে, সৌদি আপত্তির কারণেই হরমুজে জাহাজ এসকর্টের পরিকল্পনাটি দ্রুত স্থগিত করতে হয়। তুর্কিয়ে টুডে ও ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্পের ঘোষণা সৌদি নেতৃত্বকে অপ্রস্তুত করে এবং রিয়াদ পরে ওয়াশিংটনকে জানায়, তারা এই অভিযানে সামরিক সুবিধা দেবে না।

 

মার্কিন কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, শুধু সৌদি আরব নয়; কুয়েতও তাদের আকাশসীমা ও ঘাঁটি এই অভিযানে ব্যবহারের সুযোগ সীমিত করে। ফলে উপসাগরীয় মিত্রদের সহায়তা ছাড়া হরমুজে বড় সামরিক এসকর্ট অভিযান চালানো যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। বিনিয়োগবিষয়ক সংবাদমাধ্যম ইনভেস্টিং ডটকমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কুয়েতও মার্কিন ঘাঁটি ও আকাশসীমা ব্যবহারে বাধা দিয়েছে বলে আঞ্চলিক সূত্রগুলো জানিয়েছে।

 

‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ মূলত হরমুজ প্রণালিতে আটকে পড়া বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে নিরাপদে বের করে আনার একটি মার্কিন পরিকল্পনা ছিল। ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের কারণে গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথে জাহাজ চলাচল দীর্ঘদিন ধরে ব্যাহত হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড আগে জানিয়েছিল, তারা হরমুজে নৌচলাচলের স্বাধীনতা পুনরুদ্ধারে অভিযান শুরু করেছে। তবে কয়েক দিনের মধ্যেই ট্রাম্প ঘোষণা দেন, ইরানের সঙ্গে সম্ভাব্য শান্তি চুক্তি এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ দিতে অভিযানটি সাময়িকভাবে স্থগিত থাকবে।

 

হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা দাবি করেছেন, আঞ্চলিক মিত্রদের আগেই অভিযানের বিষয়ে জানানো হয়েছিল। তবে মধ্যপ্রাচ্যের এক কূটনীতিকের বরাতে এনবিসি জানিয়েছে, ট্রাম্পের প্রকাশ্য ঘোষণার পরই যুক্তরাষ্ট্র মূলত ওমানের সঙ্গে যোগাযোগ করে। ওই কূটনীতিকের ভাষ্য, ওয়াশিংটন আগে ঘোষণা দিয়েছে, পরে আঞ্চলিক পক্ষগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করেছে। এই সমন্বয়হীনতাই সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় দেশগুলোর অস্বস্তি বাড়িয়েছে বলে প্রতিবেদনে ইঙ্গিত করা হয়েছে।

 

সৌদি আরবের অবস্থানকে শুধু সামরিক আপত্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে না; এর সঙ্গে আঞ্চলিক উত্তেজনা এড়ানোর কৌশলও যুক্ত। রিয়াদ সরাসরি ইরানের সঙ্গে নতুন সংঘাতে জড়াতে চায় না। একই সঙ্গে সৌদি আরব পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শান্তি প্রচেষ্টাকে সমর্থন করছে বলে এনবিসির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। দ্য গার্ডিয়ানও জানিয়েছে, প্রজেক্ট ফ্রিডম নিয়ে সৌদি আরবের বিরূপ প্রতিক্রিয়ার পর ওয়াশিংটন কূটনৈতিক পথকে বেশি গুরুত্ব দিতে বাধ্য হয়েছে।

 

এদিকে, প্রজেক্ট ফ্রিডম স্থগিতের পর ইরানও নিজেদের অবস্থান জানায়। ইরানের বন্দর ও সামুদ্রিক সংস্থা জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি ও আশপাশের এলাকায় অবস্থানরত বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে তারা প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে প্রস্তুত। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান প্রায় ২০ হাজার আটকে পড়া নাবিকের জন্য জ্বালানি, চিকিৎসা সহায়তা, কারিগরি সহায়তা ও জরুরি সেবা দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে। তেহরান জানিয়েছে, প্রয়োজন হলে জাহাজগুলো ইরানি বন্দরে গিয়ে খাদ্য, জ্বালানি, মেরামত ও চিকিৎসা সহায়তা নিতে পারবে।

 

হরমুজ প্রণালি বিশ্ব জ্বালানি বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ। এই প্রণালি দিয়ে বৈশ্বিক তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহের বড় অংশ পরিবাহিত হয়। তাই প্রজেক্ট ফ্রিডম স্থগিত, সৌদি-কুয়েতের আপত্তি এবং ইরানের পাল্টা মানবিক সহায়তার ঘোষণা-সব মিলিয়ে সংকটটি এখন শুধু সামরিক নয়, কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকেও জটিল হয়ে উঠেছে।

 

তবে প্রজেক্ট ফ্রিডম স্থগিত হলেও যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলোর ওপর আরোপিত নৌ অবরোধ প্রত্যাহার করেনি। ওয়াশিংটন বলছে, এই অবরোধ ইরানের তেল রপ্তানি ও যুদ্ধ অর্থায়নের পথ সংকুচিত করার জন্য। অন্যদিকে তেহরান এটিকে অবৈধ চাপ হিসেবে দেখছে এবং বলছে, হরমুজের নিরাপত্তা তাদের নিয়ন্ত্রণেই থাকবে।

 

তথ্যসূত্র: দ্য গার্ডিয়ান ও গালফ নিউজ


সম্পর্কিত নিউজ