যুদ্ধ শেষের পথে ইরান, ট্রাম্পের প্রস্তাবে তেহরান কী জবাব দেবে?

যুদ্ধ শেষের পথে ইরান, ট্রাম্পের প্রস্তাবে তেহরান কী জবাব দেবে?
ছবির ক্যাপশান, জাগরণ ছবি

ইরান যুদ্ধ অবসানের সম্ভাবনা ঘিরে নতুন কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া একটি শান্তি প্রস্তাব এখন পর্যালোচনা করছে তেহরান। এর মধ্যেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরানের সঙ্গে আলোচনা এগোচ্ছে এবং যুদ্ধ দ্রুত শেষ হতে পারে। তবে একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করে বলেছেন, চুক্তি না হলে যুক্তরাষ্ট্র আবারও কঠোর সামরিক পদক্ষেপ নিতে পারে।

রয়টার্স জানিয়েছে, ওয়াশিংটনের প্রস্তাবটি একটি এক পৃষ্ঠার সমঝোতা স্মারক ঘিরে তৈরি। সূত্রের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই প্রস্তাব যুদ্ধ আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ করার পথ খুলে দিতে পারে। প্রাথমিক সমঝোতা হলে পরবর্তী ৩০ দিনে বিস্তারিত আলোচনার মাধ্যমে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া, ইরানের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিতে সীমা নির্ধারণের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনা হতে পারে।

 

ট্রাম্প হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের বলেন, গত ২৪ ঘণ্টায় ইরানের সঙ্গে খুব ভালো আলোচনা হয়েছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ইরান চুক্তি করতে চায় এবং সমঝোতার সম্ভাবনা রয়েছে। পরে তিনি আরও বলেন, যুদ্ধ দ্রুত শেষ হতে পারে। তবে ট্রাম্প একই সঙ্গে জানিয়ে দিয়েছেন, আলোচনা ব্যর্থ হলে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক হামলায় ফিরতে পারে।

 

তেহরানের অবস্থান এখনো সতর্ক। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র জানিয়েছেন, প্রস্তাবটি পর্যালোচনা চলছে এবং তেহরান পরে আনুষ্ঠানিক জবাব জানাবে। ইরানের পার্লামেন্টের পররাষ্ট্রনীতি ও জাতীয় নিরাপত্তা কমিটির মুখপাত্র ইব্রাহিম রেজায়ি মার্কিন প্রস্তাবকে বাস্তবসম্মত উদ্যোগের চেয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ইচ্ছার তালিকা হিসেবে বর্ণনা করেছেন। এতে বোঝা যাচ্ছে, আলোচনার টেবিলে অগ্রগতি থাকলেও দুই পক্ষের মধ্যে অবিশ্বাস এখনো বড় বাধা।

 

প্রস্তাবের গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর একটি হলো হরমুজ প্রণালি। যুদ্ধ শুরুর আগে বৈশ্বিক তেল ও গ্যাস সরবরাহের বড় অংশ এই জলপথ দিয়ে যেত। সংঘাতের কারণে সেখানে চলাচল সীমিত হয়ে পড়ে, যা জ্বালানি বাজারে বড় চাপ তৈরি করেছে। সম্ভাব্য সমঝোতার খবরে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমে এবং শেয়ারবাজারে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। বাজার বিশ্লেষকদের ধারণা, বিনিয়োগকারীরা আশা করছেন, আরও বড় সামরিক সংঘাত আপাতত এড়ানো যেতে পারে।

 

তবে প্রস্তাবের দুর্বল জায়গাও রয়েছে। Reuters জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি বড় দাবি এখনো অস্পষ্ট বা অমীমাংসিত। এর মধ্যে রয়েছে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি, মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর প্রতি তেহরানের সমর্থন এবং ইরানের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত। এসব বিষয়ে কোনো স্পষ্ট ছাড় না থাকলে চূড়ান্ত চুক্তি করা কঠিন হতে পারে।

 

আল-জাজিরা জানিয়েছে, ইরানি কর্মকর্তারা চুক্তির সম্ভাবনা নিয়ে অতিরিক্ত আশাবাদ দেখাচ্ছেন না। ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানকে কটাক্ষ করেছেন। তার বক্তব্যে বোঝা যায়, তেহরান মনে করছে ওয়াশিংটন হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলতে চাপ তৈরি করতে চায়, কিন্তু ইরানের মূল দাবি বা নিরাপত্তা উদ্বেগের যথেষ্ট স্বীকৃতি দিচ্ছে না।

 

এর আগে ট্রাম্প হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলতে মার্কিন নৌ মিশন স্থগিত করেন। তিনি আলোচনায় অগ্রগতির কথা উল্লেখ করেন। তবে মার্কিন বাহিনী এলাকায় অবরোধ ও নজরদারি বজায় রেখেছে বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এর ফলে শান্তি আলোচনার পাশাপাশি সামরিক উত্তেজনাও পুরোপুরি কমেনি।

 

বিশ্লেষকদের মতে, এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো তেহরানের আনুষ্ঠানিক জবাব। ইরান যদি প্রস্তাবের ভিত্তিতে আলোচনায় রাজি হয়, তাহলে যুদ্ধ বন্ধে একটি প্রাথমিক রাজনৈতিক কাঠামো তৈরি হতে পারে। কিন্তু পারমাণবিক কর্মসূচি, ইউরেনিয়াম মজুত, হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ এবং নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার নিয়ে সমঝোতা না হলে পরিস্থিতি আবারও সংঘাতের দিকে যেতে পারে।

 

এই মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্র আশাবাদী বার্তা দিচ্ছে, আর ইরান সতর্কভাবে প্রস্তাব যাচাই করছে। ফলে যুদ্ধ শেষের দরজা কিছুটা খুললেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো অনিশ্চিত। আগামী কয়েক দিনের কূটনৈতিক পদক্ষেপই ঠিক করবে, মধ্যপ্রাচ্য নতুন শান্তি প্রক্রিয়ার দিকে যাবে, নাকি আবারও হামলা ও পাল্টা হামলার ঝুঁকিতে ফিরবে।


সম্পর্কিত নিউজ