এক সপ্তাহের মধ্যেই ইরানের সঙ্গে চুক্তি হতে পারে: ট্রাম্প

এক সপ্তাহের মধ্যেই ইরানের সঙ্গে চুক্তি হতে পারে: ট্রাম্প
ছবির ক্যাপশান, ছবি: সংগৃহীত

ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধ অবসানে এক সপ্তাহের মধ্যেই একটি সমঝোতা বা চুক্তি চূড়ান্ত হতে পারে বলে আশা প্রকাশ করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ফক্স নিউজের সাংবাদিক ব্রেট বায়ার বুধবার এক লাইভ অনুষ্ঠানে জানান, তিনি কিছুক্ষণ আগে ট্রাম্পের সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন এবং প্রেসিডেন্ট প্রস্তাবিত সমঝোতা স্মারক বা এমওইউ নিয়ে “সতর্ক আশাবাদী”। বায়ারের ভাষ্য অনুযায়ী, সময়সীমা জানতে চাইলে ট্রাম্প বলেছেন-সবকিছু পরিকল্পনামতো এগোলে এক সপ্তাহের মধ্যেই এটি চূড়ান্ত হতে পারে। আনাদোলু ও মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক কয়েকটি সংবাদমাধ্যম এই তথ্য প্রকাশ করেছে।

এই মন্তব্য এমন সময় এলো, যখন রয়টার্স জানিয়েছে, পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান যুদ্ধ শেষ করতে এক পৃষ্ঠার একটি সমঝোতা স্মারকের কাছাকাছি পৌঁছেছে। শান্তি প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত পাকিস্তানের একটি সূত্র রয়টার্সকে বলেছে, “আমরা খুব দ্রুতই এটি শেষ করব। আমরা কাছাকাছি পৌঁছে গেছি।” সূত্রটি অ্যাক্সিওসের আগের প্রতিবেদনের সত্যতাও নিশ্চিত করেছে, যেখানে বলা হয়েছিল-ওয়াশিংটন ও তেহরান একটি সংক্ষিপ্ত এমওইউর মাধ্যমে যুদ্ধ আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ করার কাঠামো নিয়ে এগোচ্ছে।

 

অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সম্ভাব্য সমঝোতা স্মারকটি এক পৃষ্ঠার হলেও এতে ১৪ দফার একটি কাঠামো থাকতে পারে। এটি শুধু যুদ্ধ বন্ধের ঘোষণা নয়; বরং পরবর্তী ৩০ দিনের বিস্তারিত পারমাণবিক আলোচনা শুরু করার ভিত্তি হিসেবেও কাজ করবে। সম্ভাব্য শর্তগুলোর মধ্যে আছে-ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণে সাময়িক স্থগিতাদেশ, উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ইরানের বাইরে সরিয়ে নেওয়া, যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, বিদেশে জব্দ থাকা ইরানি সম্পদ ফেরত এবং হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের বিধিনিষেধ ধাপে ধাপে শিথিল করা।

 

ফক্স নিউজের ব্রেট বায়ার জানিয়েছেন, সম্ভাব্য চুক্তির দুটি বিষয়কে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে-প্রথমত, ইরানের উচ্চমাত্রার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম তৃতীয় কোনো নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া; দ্বিতীয়ত, হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি উন্মুক্ত ও নিরাপদ রাখা। হরমুজ প্রণালি বিশ্ব জ্বালানি বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ। যুদ্ধ শুরুর পর এই জলপথে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় আন্তর্জাতিক তেলের বাজারে বড় অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল।

 

একই দিন হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় ট্রাম্প বলেন, ইরানের সঙ্গে আলোচনা “খুব ভালোভাবে” এগোচ্ছে। তার দাবি, ইরানও আলোচনা করতে এবং চুক্তিতে আসতে চায়। তবে তিনি একই সঙ্গে সতর্ক ভাষায় বলেন, শেষ পর্যন্ত কী হয় তা দেখতে হবে। ট্রাম্পের এই অবস্থানকে মার্কিন প্রশাসনের “cautious optimism” বা সতর্ক আশাবাদ হিসেবে দেখছেন পর্যবেক্ষকেরা।

 

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের একতরফা হামলার পর সংঘাত শুরু হয়। জবাবে ইরান ইসরায়েল এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের লক্ষ্য করে পাল্টা হামলা চালায়। এরপর হরমুজ প্রণালি কার্যত অচল হয়ে পড়ে। পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ৮ এপ্রিল থেকে একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও সেটি স্থায়ী চুক্তিতে রূপ নেয়নি। পরে ট্রাম্প কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা ছাড়াই যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ান।

 

আরো পড়ুন : যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধ শেষ করতে প্রস্তুত ইরান: প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান

 

১৩ এপ্রিল থেকে ইরানি বন্দর ও সংশ্লিষ্ট জাহাজ চলাচলের ওপর নৌ অবরোধ আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্র। ওয়াশিংটনের দাবি, এই অবরোধ ইরানের তেল রপ্তানি ও যুদ্ধ অর্থায়নের পথ সংকুচিত করছে। অন্যদিকে তেহরান এটিকে অবৈধ ও আগ্রাসী পদক্ষেপ বলে মনে করছে। সাম্প্রতিক আলোচনার অংশ হিসেবে হরমুজ প্রণালিতে দুই পক্ষের বিধিনিষেধ ধাপে ধাপে শিথিল করার বিষয়টি আলোচনায় আছে বলে অ্যাক্সিওস ও রয়টার্স জানিয়েছে।

 

গত মঙ্গলবার ট্রাম্প হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করতে মার্কিন বাহিনীর শুরু করা বিশেষ অভিযান ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ সাময়িকভাবে স্থগিত রাখার ঘোষণা দেন। তার ভাষায়, সম্ভাব্য চুক্তি চূড়ান্ত ও স্বাক্ষরের সুযোগ দিতে এই বিরতি নেওয়া হয়েছে। তবে তিনি স্পষ্ট করেছেন, ইরানি বন্দরগুলোর ওপর মার্কিন নৌ অবরোধ পূর্ণ শক্তিতে বহাল থাকবে। এই সিদ্ধান্তের পরই চুক্তির সম্ভাবনা নিয়ে বাজারে আশাবাদ তৈরি হয় এবং তেলের দাম কমতে শুরু করে।

 

তবে চুক্তি এখনো নিশ্চিত নয়। অ্যাক্সিওস জানিয়েছে, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ স্থগিতের মেয়াদ নিয়ে মতপার্থক্য রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘমেয়াদি স্থগিতাদেশ চাইছে, আর ইরান তুলনামূলক স্বল্পমেয়াদি প্রতিশ্রুতি দিতে আগ্রহী। আলোচনায় ১৫ বছরকে সম্ভাব্য আপসের জায়গা হিসেবে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে ইরানের অভ্যন্তরীণ নেতৃত্বের ভেতরেও সম্ভাব্য চুক্তি নিয়ে ভিন্নমত আছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

 

ইরান জানিয়েছে, তারা যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাব পর্যালোচনা করছে। তবে তেহরানের অবস্থান হলো-শুধু “ন্যায্য” ও “পূর্ণাঙ্গ” চুক্তিই তারা গ্রহণ করবে। ইরানের কর্মকর্তারা বলছেন, নিষেধাজ্ঞা, নৌ অবরোধ, জব্দ সম্পদ, হরমুজ প্রণালি এবং পারমাণবিক অধিকার-সবকিছু একসঙ্গে বিবেচনায় না আনলে চুক্তি টেকসই হবে না।

তথ্যসূত্র: রয়টার্স


সম্পর্কিত নিউজ