{{ news.section.title }}
ইউক্রেনের সঙ্গে অস্থায়ী যুদ্ধবিরতির ঘোষণা রাশিয়ার
রাশিয়া দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বিজয়ের ৮১তম বার্ষিকী উপলক্ষে ইউক্রেনের বিরুদ্ধে সাময়িক যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দিয়েছে। রুশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এই যুদ্ধবিরতি আগামী ৮ ও ৯ মে কার্যকর থাকবে। মস্কোর দাবি, বিজয় দিবসের আনুষ্ঠানিকতা ও জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে ইউক্রেন পাল্টা জানিয়েছে, তারা রাশিয়ার ঘোষিত তারিখের অপেক্ষা না করে ৫ মে দিবাগত রাত ১২টা, অর্থাৎ ৬ মে থেকে যুদ্ধবিরতি কার্যকর করতে প্রস্তুত। ফলে দুই পক্ষের ঘোষণায় এখন তৈরি হয়েছে ‘পাল্টাপাল্টি যুদ্ধবিরতি’র পরিস্থিতি।
রাশিয়ায় প্রতি বছর ৯ মে ‘ভিক্টরি ডে’ বা বিজয় দিবস হিসেবে পালিত হয়। নাৎসি জার্মানির বিরুদ্ধে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিজয় স্মরণে মস্কোর রেড স্কয়ারে বড় সামরিক কুচকাওয়াজ আয়োজন করা হয়। চলতি বছরও সেই আয়োজনের প্রস্তুতি চলছে। তবে ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলার ঝুঁকি মাথায় রেখে এবারের কুচকাওয়াজ আগের তুলনায় সীমিত করার কথা জানিয়েছে রাশিয়া। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে এবারের প্যারেডে সামরিক সরঞ্জাম প্রদর্শনের পরিসর কমানো হচ্ছে।
রুশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় বলেছে, তারা আশা করছে ইউক্রেনও এই সময় যুদ্ধবিরতি মেনে চলবে। তবে একই সঙ্গে মস্কো সতর্ক করেছে, বিজয় দিবসের অনুষ্ঠান বা রাশিয়ার ভূখণ্ডে কোনো হামলার চেষ্টা হলে “কঠোর” ও “ব্যাপক” সামরিক জবাব দেওয়া হবে। এপি জানিয়েছে, রাশিয়া কিয়েভে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার হুমকিও দিয়েছে, যদি ইউক্রেন বিজয় দিবসের আয়োজন ব্যাহত করার চেষ্টা করে।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি রাশিয়ার ঘোষণাকে যথেষ্ট আন্তরিক বলে মনে করছেন না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি লিখেছেন, যুদ্ধবিরতির বিষয়ে ইউক্রেনের কাছে কোনো আনুষ্ঠানিক অনুরোধ আসেনি। তার ভাষায়, “মানুষের জীবন যেকোনো উৎসবের চেয়ে অনেক বেশি মূল্যবান।” জেলেনস্কি আরও বলেন, এখন রাশিয়ার উচিত যুদ্ধ শেষ করার বাস্তব পদক্ষেপ নেওয়া, শুধু প্রতীকী তারিখ ঘিরে সাময়িক বিরতির ঘোষণা দেওয়া নয়।
জেলেনস্কি পরে ঘোষণা দেন, ইউক্রেন ৬ মে থেকে যুদ্ধবিরতি শুরুর জন্য প্রস্তুত। তার বক্তব্য, যদি সত্যিই ‘নীরবতা’ কার্যকর করতে হয়, তবে তা এখনই সম্ভব; বিজয় দিবসের আনুষ্ঠানিকতার জন্য অপেক্ষা করার প্রয়োজন নেই। আল জাজিরা জানিয়েছে, কিয়েভ রাশিয়ার ঘোষণাকে “গুরুতর নয়” বলে দেখছে, কারণ মস্কো যুদ্ধবিরতিকে সামরিক উৎসবের নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত করেছে, স্থায়ী শান্তির পথে বাস্তব আলোচনার সঙ্গে নয়।
এই পাল্টাপাল্টি যুদ্ধবিরতির ঘোষণা এমন সময়ে এলো, যখন যুদ্ধক্ষেত্রে হামলা অব্যাহত রয়েছে। দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক রুশ ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ইউক্রেনের খারকিভ ও জাপোরিঝিয়া অঞ্চলে বেসামরিক হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। অন্যদিকে ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলায় রাশিয়ার বেলগোরোদ অঞ্চলেও ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে। ফলে দুই পক্ষ যুদ্ধবিরতির কথা বললেও মাঠের বাস্তবতা এখনো উত্তপ্ত।
এর আগেও রাশিয়া ও ইউক্রেন ধর্মীয় বা প্রতীকী উপলক্ষে সাময়িক যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছিল। গত এপ্রিলে অর্থডক্স ইস্টার উপলক্ষে ৩২ ঘণ্টার যুদ্ধবিরতি হয়েছিল। তবে সেই বিরতিও পুরোপুরি শান্তিপূর্ণ ছিল না; দুই পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলেছিল। তাই এবার ৮–৯ মের যুদ্ধবিরতি সত্যিই কার্যকর হবে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, রাশিয়ার এই ঘোষণা সামরিকের চেয়ে বেশি রাজনৈতিক ও প্রতীকী। ভিক্টরি ডে রাশিয়ার জাতীয় পরিচয় ও রাষ্ট্রীয় প্রচারণার বড় অংশ। প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বহু বছর ধরে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বিজয়কে বর্তমান রুশ সামরিক নীতির সঙ্গে যুক্ত করে দেখিয়ে আসছেন। তাই এই সময় মস্কো চায় রাজধানী ও বড় শহরগুলোতে বড় হামলা বা নিরাপত্তা ব্যর্থতার দৃশ্য এড়াতে।
অন্যদিকে ইউক্রেন রাশিয়ার ঘোষণাকে চাপের কৌশল হিসেবে দেখছে। কিয়েভের মতে, মস্কো যুদ্ধবিরতিকে এমনভাবে সাজাচ্ছে যাতে বিজয় দিবসের অনুষ্ঠান নিরাপদ থাকে, কিন্তু যুদ্ধ শেষ করার বড় প্রশ্নে কোনো বাস্তব ছাড় দিতে না হয়। জেলেনস্কির আগাম যুদ্ধবিরতি ঘোষণার মধ্য দিয়ে কিয়েভ দেখাতে চাইছে-তারা শান্তির বিপক্ষে নয়, বরং রাশিয়ার শর্তযুক্ত ও প্রতীকী বিরতির চেয়ে বাস্তব নীরবতা চায়।
পশ্চিমা পর্যবেক্ষকদের মতে, ৮–৯ মে যদি দুই পক্ষ সত্যিই হামলা বন্ধ রাখে, তবে তা ভবিষ্যৎ আলোচনার জন্য সীমিত আস্থার পরিবেশ তৈরি করতে পারে। কিন্তু যদি যুদ্ধবিরতি ভেঙে যায়, তাহলে উভয় পক্ষই একে অপরকে দায়ী করবে এবং সংঘাত আরও তীব্র হতে পারে। বিশেষ করে রাশিয়ার “ব্যাপক পাল্টা হামলার” হুমকি পরিস্থিতিকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে।