{{ news.section.title }}
জার্মানি থেকে ৫ হাজার সেনা সরাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র
ইরান যুদ্ধ নিয়ে ন্যাটো মিত্রদের সঙ্গে ক্রমবর্ধমান দ্বন্দ্বের মধ্যে জার্মানি থেকে ৫ হাজার মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। পেন্টাগনের ঘোষণায় বলা হয়েছে, আগামী ছয় মাস থেকে এক বছরের মধ্যে এই সেনা প্রত্যাহার সম্পন্ন হবে। এর ফলে জার্মানিতে মার্কিন সেনা উপস্থিতি ২০২২ সালে রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণের আগের পর্যায়ে ফিরে যাবে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রেডরিখ ম্যার্ৎস ইরান যুদ্ধ নিয়ে ওয়াশিংটনের কৌশলের সমালোচনা করার পরই এই সিদ্ধান্ত সামনে আসে। গত সোমবার জার্মানির মার্সবার্গে শিক্ষার্থীদের এক অনুষ্ঠানে ম্যার্ৎস বলেন, ইরানের নেতৃত্ব যুক্তরাষ্ট্রকে “অপমানিত” করছে এবং ওয়াশিংটন যুদ্ধ থেকে বের হওয়ার স্পষ্ট পথ খুঁজে পাচ্ছে না। তিনি আরও ইঙ্গিত দেন, ইউরোপীয় মিত্রদের যথাযথভাবে না জানিয়েই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরান যুদ্ধ শুরু করেছে।
পেন্টাগনের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেন, জার্মান চ্যান্সেলরের মন্তব্য “অনুচিত” ও “অসহযোগিতামূলক”। তার ভাষায়, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই ধরনের “নেতিবাচক ও অনুৎপাদনশীল” বক্তব্যের যথাযথ প্রতিক্রিয়া দিচ্ছেন। তবে পেন্টাগন আনুষ্ঠানিকভাবে এটিকে শুধু রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে নয়, বরং ইউরোপকে নিজেদের নিরাপত্তার বেশি দায়িত্ব নেওয়ার ট্রাম্প প্রশাসনের বৃহত্তর নীতির অংশ হিসেবেও ব্যাখ্যা করছে।
জার্মানিতে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় ইউরোপীয় সামরিক উপস্থিতি
জার্মানি দীর্ঘদিন ধরে ইউরোপে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটি ও লজিস্টিক কেন্দ্র। বর্তমানে দেশটিতে প্রায় ৩৫ থেকে ৩৬ হাজার মার্কিন সেনা রয়েছে। এপি জানিয়েছে, ৫ হাজার সেনা সরিয়ে নেওয়া হলে জার্মানিতে মার্কিন উপস্থিতি প্রায় ১৪ শতাংশ কমবে। দেশটিতে যুক্তরাষ্ট্রের কমান্ড সেন্টার, বিমানঘাঁটি, প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ও গুরুত্বপূর্ণ সামরিক অবকাঠামো রয়েছে, যা শুধু ইউরোপ নয়, মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকায় মার্কিন সামরিক কার্যক্রমের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
রাশিয়া ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে পূর্ণ মাত্রার সামরিক অভিযান শুরু করার পর তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ইউরোপে অতিরিক্ত সেনা মোতায়েন করেন। জার্মানির অনুরোধে এবং ন্যাটোর পূর্বাঞ্চলীয় প্রতিরক্ষা জোরদারের অংশ হিসেবে সেই সেনা বৃদ্ধি করা হয়েছিল। এখন ৫ হাজার সেনা প্রত্যাহার করা হলে মার্কিন উপস্থিতি অনেকটাই যুদ্ধ-পূর্ব অবস্থায় ফিরে যাবে বলে পেন্টাগনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
ইরান যুদ্ধ নিয়ে ওয়াশিংটন-বার্লিন দূরত্ব
ইরান যুদ্ধ নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসন ও ইউরোপীয় মিত্রদের মধ্যে বেশ কিছুদিন ধরেই মতপার্থক্য বাড়ছিল। আল জাজিরা জানিয়েছে, ম্যার্ৎসের মন্তব্যের পর ট্রাম্প প্রকাশ্যে তাকে তিরস্কার করেন এবং বলেন, জার্মান চ্যান্সেলর “কী বলছেন তা জানেন না”। ট্রাম্পের দাবি, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে ঠেকাতে সামরিক পদক্ষেপ প্রয়োজন ছিল।
এরপর ২৯ এপ্রিল ট্রাম্প নিজেই ট্রুথ সোশ্যালে জানান, তার প্রশাসন জার্মানিতে মার্কিন সেনা কমানোর সম্ভাবনা পর্যালোচনা করছে। তিনি জার্মানিসহ কয়েকটি ন্যাটো মিত্রকে হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু করতে যথেষ্ট সহায়তা না করার জন্যও সমালোচনা করেন। রয়টার্সের ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, ট্রাম্প প্রশাসনের দৃষ্টিতে ইউরোপীয় দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পদক্ষেপ থেকে নিরাপত্তা সুবিধা পেলেও ঝুঁকি ও ব্যয়ের যথেষ্ট অংশ নিচ্ছে না।
শুধু জার্মানি নয়, ইতালি-স্পেনকেও সতর্কবার্তা
দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্প শুধু জার্মানির ক্ষেত্রেই সেনা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেননি, ইতালি ও স্পেন থেকেও সেনা উপস্থিতি কমানোর হুমকি দিয়েছেন। কারণ, এসব দেশ ইরান যুদ্ধ ও হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার মার্কিন প্রচেষ্টায় পর্যাপ্ত সহযোগিতা করছে না বলে ওয়াশিংটন মনে করছে। ইতালি সিসিলির সিগোনেলা ঘাঁটি ব্যবহারে সীমাবদ্ধতার কথা জানায়, আর স্পেন যুদ্ধবিরোধী অবস্থান নিয়ে মার্কিন ঘাঁটি ব্যবহারে আপত্তি জানায়।
এমন সিদ্ধান্ত ন্যাটোর ভেতরে রাজনৈতিক চাপ আরও বাড়াতে পারে। কারণ জার্মানি শুধু একটি মিত্র দেশ নয়, ইউরোপে মার্কিন সামরিক উপস্থিতির প্রধান কেন্দ্র। জার্মানি থেকে সেনা কমানো মানে ন্যাটোর সামগ্রিক প্রতিরক্ষা পরিকল্পনা, ইউরোপীয় প্রতিরোধ সক্ষমতা, রাশিয়ার বিরুদ্ধে কৌশল এবং মধ্যপ্রাচ্য-আফ্রিকায় মার্কিন অপারেশনের লজিস্টিক কাঠামোতেও প্রভাব পড়তে পারে।
সমালোচনা ও নিরাপত্তা উদ্বেগ
এপি জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের ডেমোক্র্যাট নেতা ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকেরা এই সিদ্ধান্তের কঠোর সমালোচনা করেছেন। সিনেট আর্মড সার্ভিসেস কমিটির শীর্ষ ডেমোক্র্যাট জ্যাক রিড এই পদক্ষেপকে “বেপরোয়া” ও দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তার জন্য বিপজ্জনক বলে মন্তব্য করেছেন। তার মতে, ন্যাটো মিত্রদের শাস্তি দিতে সেনা প্রত্যাহার করলে রাশিয়া লাভবান হতে পারে এবং ইউরোপে যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বাসযোগ্যতা কমবে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, জার্মানির ঘাঁটিগুলো যুক্তরাষ্ট্রের জন্য শুধু প্রতীকী নয়, বাস্তব সামরিক সুবিধার জায়গা। রামস্টাইন বিমানঘাঁটি, ইউরোপীয় কমান্ড, লজিস্টিক সাপোর্ট নেটওয়ার্ক ও চিকিৎসা অবকাঠামো মার্কিন সামরিক পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ফলে সেনা কমালেও অবকাঠামোগত নির্ভরতা পুরোপুরি কমানো সহজ হবে না।
বার্লিনের অবস্থান
ম্যার্ৎস পরে ট্রান্সআটলান্টিক সম্পর্কের গুরুত্বের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন। রয়টার্স জানিয়েছে, তিনি সরাসরি ট্রাম্পের সেনা কমানোর মন্তব্য নিয়ে বিস্তারিত কথা না বললেও বলেন, জার্মানি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অংশীদারত্ব বজায় রাখতে চায় এবং নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ হলে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলতে সামরিক মিশনে অংশগ্রহণের বিষয় বিবেচনা করতে প্রস্তুত।
তবে বার্লিনের ভেতরেও এখন প্রশ্ন উঠছে, ইউরোপের নিরাপত্তা কাঠামো কতটা যুক্তরাষ্ট্রনির্ভর থাকবে। ট্রাম্প প্রশাসনের আগের মেয়াদেও জার্মানি থেকে সেনা প্রত্যাহারের পরিকল্পনা ছিল, তবে বাইডেন ক্ষমতায় এসে তা স্থগিত করেন। এবার ইরান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে সেই পুরোনো বিতর্ক আবার নতুন করে সামনে এসেছে।
ন্যাটোর জন্য কী বার্তা
এই সিদ্ধান্ত ন্যাটোর ভেতরে একটি স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে-ট্রাম্প প্রশাসন ইউরোপীয় মিত্রদের কাছ থেকে শুধু প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানো নয়, মার্কিন সামরিক অভিযানে রাজনৈতিক ও বাস্তব সহযোগিতাও প্রত্যাশা করছে। ইরান যুদ্ধ নিয়ে ইউরোপীয় দ্বিধা, হরমুজ প্রণালি ঘিরে মতভেদ এবং জার্মান চ্যান্সেলরের প্রকাশ্য সমালোচনা ওয়াশিংটনের সঙ্গে বার্লিনের সম্পর্ককে নতুন চাপের মুখে ফেলেছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্র জার্মানি থেকে ৫ হাজার সেনা সরালেও জার্মানিতে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি পুরোপুরি শেষ হচ্ছে না। দেশটিতে এখনো কয়েক দশক ধরে গড়ে ওঠা কমান্ড, বিমান, গোয়েন্দা, চিকিৎসা ও লজিস্টিক অবকাঠামো থাকবে। কিন্তু এই প্রত্যাহার রাজনৈতিকভাবে বড় বার্তা বহন করছে-ইরান যুদ্ধ শুধু মধ্যপ্রাচ্যেই নয়, ন্যাটো জোটের ভেতরেও বিভাজন তৈরি করছে।
ইরান যুদ্ধ নিয়ে মতবিরোধের জেরে জার্মানি থেকে ৫ হাজার সেনা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্র-জার্মানি সম্পর্কে বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে। ওয়াশিংটন বলছে, ইউরোপকে নিজেদের নিরাপত্তার বেশি দায়িত্ব নিতে হবে এবং মিত্রদের অনুৎপাদনশীল সমালোচনা সহ্য করা হবে না। অন্যদিকে সমালোচকদের মতে, এই সিদ্ধান্ত ন্যাটোর ঐক্য দুর্বল করবে এবং রাশিয়ার জন্য কৌশলগত সুবিধা তৈরি করতে পারে।
তথ্যসূত্র: রয়টার্স