বিশাল বিমান চুক্তির পথে চীন-যুক্তরাষ্ট্র

বিশাল বিমান চুক্তির পথে চীন-যুক্তরাষ্ট্র
ছবির ক্যাপশান, ছবি: সংগৃহীত

মার্কিন বিমান নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোয়িংয়ের ২০০টি বিমান কিনতে সম্মত হয়েছে চীন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, ভবিষ্যতে এই অর্ডার বেড়ে ৭৫০টি পর্যন্ত হতে পারে। খবর আলজাজিরার। শুক্রবার এয়ার ফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প বলেন, চুক্তিতে প্রায় ২০০টি বিমান রয়েছে। এগুলো ভালোভাবে পরিচালিত হলে অর্ডার ৭৫০টি পর্যন্ত যেতে পারে।

তিনি জানান, এসব বিমানে জিই অ্যারোস্পেসের ইঞ্জিন ব্যবহার করা হবে। তবে কোন ধরনের বিমান কেনা হবে কিংবা কবে সরবরাহ দেওয়া হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানাননি তিনি। এখন পর্যন্ত চীনা সরকার বা বোয়িং আনুষ্ঠানিকভাবে চুক্তির বিষয়টি নিশ্চিত করেনি। তবে চুক্তি বাস্তবায়িত হলে তা বোয়িংয়ের জন্য বড় সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ওয়াশিংটন-বেইজিং বাণিজ্য উত্তেজনার কারণে চীনের বাজারে পিছিয়ে পড়েছিল মার্কিন প্রতিষ্ঠানটি।

 

বোয়িংয়ের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা কেলি অর্টবার্গ ট্রাম্পের বেইজিং সফরে মার্কিন ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদলের সঙ্গে ছিলেন। ওই সফরে চীনের কাছে বিভিন্ন মার্কিন পণ্য ও সেবা বিক্রির চেষ্টা চালানো হয়। তবে ঘোষিত ২০০ বিমানের কতগুলো নতুন অর্ডার এবং কতগুলো আগের প্রতিশ্রুতির অংশ, তা এখনো স্পষ্ট নয়। বিশ্লেষকদের মতে, অতীতেও চীন বিদেশি নেতাদের সফরের সময় নতুন ও পুরোনো অর্ডার একসঙ্গে ঘোষণা করেছে।

 

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বড় এই চুক্তি চীনের দ্রুত সম্প্রসারিত বিমান পরিবহন খাতকে শক্তিশালী করবে। বিশেষ করে দেশীয় নির্মাতা কোম্যাক-এর সি৯১৯ উড়োজাহাজ এখনো প্রত্যাশিত উৎপাদন পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি। এ ছাড়া এই চুক্তি ইউরোপীয় প্রতিদ্বন্দ্বী এয়ারবাস-এর সঙ্গে প্রতিযোগিতায় বোয়িংকে এগিয়ে যেতে সহায়তা করবে বলেও মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

 

বিমান খাতভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান আইবিএর হিসাব অনুযায়ী, ২০০টি বিমানের সম্ভাব্য চুক্তিমূল্য ১৭ থেকে ১৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার হতে পারে।


চীনের বাজার বোয়িংয়ের জন্য কেন এত গুরুত্বপূর্ণ

বিশ্বের অন্যতম বড় এভিয়েশন মার্কেট হলো চীন। আন্তর্জাতিক বিমান পরিবহন সংস্থা আইএটিএর পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী দুই দশকে চীন বিশ্বের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক বিমান বাজারে পরিণত হতে পারে।

 

বিশ্লেষকদের মতে, চীনের মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠীর আয় বৃদ্ধি, অভ্যন্তরীণ ভ্রমণের চাহিদা এবং আন্তর্জাতিক রুট সম্প্রসারণের কারণে দেশটিতে নতুন বিমানের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। ফলে বোয়িং ও এয়ারবাস-উভয় প্রতিষ্ঠানের জন্যই চীনের বাজার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

 

বাণিজ্য উত্তেজনার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল বোয়িং

২০১৮ সালের পর যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে বাণিজ্য যুদ্ধ শুরু হলে দুই দেশের সম্পর্কের টানাপোড়েন সরাসরি প্রভাব ফেলে বোয়িংয়ের ওপর। রয়টার্স ও ব্লুমবার্গের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই সময় চীন অনেক ক্ষেত্রে বোয়িংয়ের নতুন অর্ডার কমিয়ে দেয় এবং ইউরোপীয় প্রতিষ্ঠান এয়ারবাস তুলনামূলক বেশি সুবিধা পায়। এ ছাড়া ৭৩৭ ম্যাক্স উড়োজাহাজ দুর্ঘটনার পর নিরাপত্তা উদ্বেগের কারণে বোয়িংকে বড় ধাক্কা সামলাতে হয়। চীন ছিল প্রথম দেশগুলোর একটি, যারা ৭৩৭ ম্যাক্স উড়োজাহাজ সাময়িকভাবে নিষিদ্ধ করেছিল।

 

কোম্যাক ও সি৯১৯: চীনের নিজস্ব বিমান প্রকল্প

চীন দীর্ঘদিন ধরেই বোয়িং ও এয়ারবাসের ওপর নির্ভরতা কমাতে নিজস্ব যাত্রীবাহী বিমান তৈরির চেষ্টা করছে। দেশটির রাষ্ট্রীয় বিমান নির্মাতা প্রতিষ্ঠান কোম্যাক (COMAC) ইতোমধ্যে সি৯১৯ উড়োজাহাজ বাজারে এনেছে। তবে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, উৎপাদন সক্ষমতা, প্রযুক্তিগত নির্ভরতা এবং বৈশ্বিক সার্টিফিকেশন জটিলতার কারণে এখনো সি৯১৯ পুরোপুরি বোয়িং বা এয়ারবাসের বিকল্প হয়ে উঠতে পারেনি।

 

জিই অ্যারোস্পেসের জন্যও বড় সুযোগ

চুক্তিতে জিই অ্যারোস্পেসের ইঞ্জিন ব্যবহারের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। কারণ, বাণিজ্যিক উড়োজাহাজ শিল্পে শুধু বিমান নির্মাতা নয়, ইঞ্জিন নির্মাতারাও বড় অঙ্কের আয় করে থাকে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে ইঞ্জিন রক্ষণাবেক্ষণ, যন্ত্রাংশ সরবরাহ এবং সার্ভিসিং থেকে কয়েক দশক ধরে রাজস্ব আসে।

 


বৈশ্বিক বিমান শিল্পে নতুন প্রতিযোগিতা

বিশ্লেষকদের মতে, এই সম্ভাব্য চুক্তি শুধু একটি বাণিজ্যিক সমঝোতা নয়; বরং এটি বৈশ্বিক বিমান শিল্পে নতুন প্রতিযোগিতারও ইঙ্গিত দিচ্ছে। বর্তমানে বিশ্ব বাণিজ্যিক উড়োজাহাজ বাজারে বোয়িং ও এয়ারবাসের আধিপত্য থাকলেও চীন ধীরে ধীরে নিজস্ব অবস্থান শক্তিশালী করার চেষ্টা করছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্কের উন্নতি হলে ভবিষ্যতে আরও বড় বাণিজ্যিক চুক্তির সম্ভাবনাও তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক বিশ্লেষকেরা।

 

তথ্যসূত্র: আল-জাজিরা


সম্পর্কিত নিউজ