জ্বালানি তেলের দাম কমাল পাকিস্তান

জ্বালানি তেলের দাম কমাল পাকিস্তান
ছবির ক্যাপশান, এআই ছবি

চলমান বৈশ্বিক জ্বালানি অস্থিরতার মধ্যেই পাকিস্তানের সাধারণ মানুষের জন্য কিছুটা স্বস্তির খবর দিয়েছে দেশটির সরকার। নতুন ঘোষণায় পেট্রোল ও ডিজেলের দাম প্রতি লিটারে ৫ রুপি কমানো হয়েছে। শনিবার (১৬ মে) থেকে দেশজুড়ে নতুন এ দাম কার্যকর হয়েছে।

শুক্রবার রাতে পাকিস্তানের পেট্রোলিয়াম ডিভিশনের জারি করা এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। দেশটির প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম ডন জানিয়েছে, নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রতি লিটার পেট্রোলের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৪০৯ দশমিক ৭৮ রুপি এবং হাই-স্পিড ডিজেলের দাম দাঁড়িয়েছে ৪০৯ দশমিক ৫৮ রুপি।

 

সরকারের এই সিদ্ধান্তে সবচেয়ে বেশি স্বস্তি পেতে পারেন মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত মানুষ। কারণ ব্যক্তিগত গাড়ি, মোটরসাইকেল, সিএনজি অটোরিকশা ও ছোট যানবাহনে মূলত পেট্রোল ব্যবহার করা হয়। ফলে দৈনন্দিন যাতায়াত ব্যয়ে কিছুটা হলেও চাপ কমবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

 

অন্যদিকে হাই-স্পিড ডিজেলের দাম কমায় ভারী যানবাহন, ট্রাক, বাস এবং শিল্পখাতে পরিচালিত জেনারেটরের ব্যয়ও কিছুটা কমতে পারে। এতে পণ্য পরিবহন খরচ কমে বাজারে নিত্যপণ্যের দামের ওপরও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।

 

বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে পাকিস্তানে জ্বালানির দাম অস্বাভাবিকভাবে বাড়তে থাকায় মূল্যস্ফীতি আরও তীব্র হয়ে ওঠে। নিত্যপণ্য, পরিবহন ভাড়া এবং শিল্প উৎপাদন ব্যয় বাড়ায় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে পড়ে। তাই নতুন এই মূল্যহ্রাস জনগণের জন্য কিছুটা হলেও স্বস্তির বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

 

গত ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে শুরু হওয়া যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরান যুদ্ধ পরিস্থিতির পর বিশ্বজুড়ে জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়। বিশেষ করে বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাস পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রুট ‘হরমুজ প্রণালি’ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম দ্রুত বেড়ে যায়।

 

বিশ্ববাজারে জ্বালানির সেই অস্থিরতার সরাসরি প্রভাব পড়ে পাকিস্তানের মতো আমদানিনির্ভর দেশগুলোতে। পাকিস্তানের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও অর্থনৈতিক সংকটের কারণে সরকারকে একের পর এক কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে পাকিস্তান সরকার প্রতি সপ্তাহের শুক্রবার রাতে জ্বালানির মূল্য পুনর্নির্ধারণের নীতি গ্রহণ করে। আন্তর্জাতিক বাজারদর, আমদানি ব্যয় এবং রুপির বিনিময় হার বিবেচনায় নিয়ে প্রতি সপ্তাহে নতুন দাম ঘোষণা করা হচ্ছে। এর ধারাবাহিকতায় গত সপ্তাহেও দেশটির সরকার প্রতি লিটার পেট্রোলে ১৪ দশমিক ৯২ রুপি এবং ডিজেলে ১৫ রুপি বাড়িয়েছিল। তবে মে মাসের মাঝামাঝি এসে সেই বাড়তি দামের একটি অংশ কমানো হলো। 

 

যুদ্ধ পরিস্থিতি শুরুর পর গত ৬ মার্চ পাকিস্তান সরকার এক ধাক্কায় পেট্রোল ও ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ৫৫ রুপি বাড়িয়ে দেয়। ওই সময় দেশজুড়ে ব্যাপক সমালোচনা তৈরি হয় এবং জনগণের মধ্যে অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে। এরপর আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম আরও বাড়লেও প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ কয়েক দফায় মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব নাকচ করে দেন। কিন্তু অর্থনৈতিক চাপ বাড়তে থাকায় সরকার পরে আবারও বড় ধরনের মূল্যবৃদ্ধি করতে বাধ্য হয়।

 

গত ২ এপ্রিল পাকিস্তানের পেট্রোলিয়াম মন্ত্রী আলী পারভেজ মালিক এবং অর্থমন্ত্রী মুহাম্মদ আওরঙ্গজেব যৌথভাবে পেট্রোলে ৪৩ শতাংশ এবং ডিজেলে প্রায় ৫৫ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধির ঘোষণা দেন। এতে দেশটিতে জ্বালানি সংকট আরও আলোচনায় আসে।

 

তবে এর ঠিক পরদিনই প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ পেট্রোলিয়াম লেভি কমানোর সিদ্ধান্ত নেন। তিনি প্রতি লিটারে ৮০ রুপি পর্যন্ত লেভি কমিয়ে পেট্রোলের দাম ৩৭৮ রুপিতে নামিয়ে আনেন। পরে গত ১০ এপ্রিল আবারও বড় ধরনের সমন্বয়ের মাধ্যমে ডিজেলের দাম লিটারে ১৩৫ রুপি এবং পেট্রোলের দাম ১২ রুপি কমানো হয়।

 

সাম্প্রতিক এই ধারাবাহিক ওঠানামা পাকিস্তানের জ্বালানি বাজারে অনিশ্চয়তার চিত্রই তুলে ধরছে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। তাদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে স্থিতিশীলতা না ফিরলে পাকিস্তানে জ্বালানির দাম আরও ওঠানামা করতে পারে।এদিকে জ্বালানির মূল্য কমানোর সিদ্ধান্তকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন পরিবহন ও ব্যবসায়ীরা। তারা বলছেন, সরকার যদি এই ধারা ধরে রাখতে পারে, তাহলে সামনের মাসগুলোতে মূল্যস্ফীতির চাপ কিছুটা কমতে পারে এবং সাধারণ মানুষের ব্যয়ও কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসবে।


সম্পর্কিত নিউজ