বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশে জ্বালানি ও খাদ্যদ্রব্যের দামে নতুন চাপের শঙ্কা, বাড়ছে মূল্যস্ফীতির উদ্বেগ

বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশে জ্বালানি ও খাদ্যদ্রব্যের দামে নতুন চাপের শঙ্কা, বাড়ছে মূল্যস্ফীতির উদ্বেগ

মধ্যপ্রাচ্য ঘিরে চলমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের অস্থিরতার প্রভাব এবার সরাসরি পড়তে শুরু করেছে বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অর্থনীতিতে। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বাড়ার পাশাপাশি খাদ্যপণ্য, সার ও পরিবহন ব্যয়ও বেড়ে যাওয়ায় নতুন করে মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা করছেন অর্থনীতিবিদরা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরান, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রকে ঘিরে সাম্প্রতিক উত্তেজনার কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি ঘিরে উদ্বেগ বাড়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দ্রুত বাড়তে শুরু করেছে। বিশ্বের বড় অংশের জ্বালানি পরিবহন এই নৌপথ দিয়ে হওয়ায় যেকোনো অস্থিরতা সরাসরি বিশ্ববাজারে প্রভাব ফেলছে।

 

বাংলাদেশেও এর প্রভাব ইতোমধ্যে দেখা যাচ্ছে। সম্প্রতি জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর পর পরিবহন খরচ, উৎপাদন ব্যয় এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে নতুন চাপ তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিল মাসে দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি আবারও ৯ শতাংশ ছাড়িয়েছে। খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভূত উভয় খাতেই দাম বৃদ্ধির কারণে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে।

 

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লে শুধু জ্বালানি নয়, কৃষি উৎপাদনও ব্যয়বহুল হয়ে পড়ে। কারণ সার উৎপাদন, কৃষিযন্ত্র পরিচালনা এবং পরিবহন খাতে জ্বালানির বড় ভূমিকা রয়েছে। ফলে গম, ভুট্টা, ভোজ্যতেলসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্যের দামও বাড়তে পারে।

 

আন্তর্জাতিক বাজার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গত কয়েক মাসে গম ও ভুট্টার দাম উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। একই সঙ্গে সার সংকট ও জ্বালানির বাড়তি দামের কারণে অনেক দেশে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এতে বৈশ্বিক খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থাও চাপে পড়তে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

 

বাংলাদেশ সরকারও সম্ভাব্য জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সাশ্রয়ী নীতির দিকে ঝুঁকছে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ আরোপ, সরকারি খাতে ব্যয় কমানো এবং আমদানি ব্যয় নিয়ন্ত্রণের মতো পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা চলছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বৈশ্বিক বাজার দীর্ঘ সময় অস্থির থাকলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপরও চাপ বাড়তে পারে।

 

বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ইতোমধ্যে পরিস্থিতি সামাল দিতে নানা পদক্ষেপ নিতে শুরু করেছে। ইউরোপের কয়েকটি দেশ জ্বালানি কর কমিয়েছে। জাপান জরুরি তেল মজুত ব্যবহারের প্রস্তুতি নিচ্ছে। দক্ষিণ কোরিয়া জ্বালানির দামে সীমা আরোপের পরিকল্পনা করছে। অন্যদিকে কিছু দেশ খাদ্যপণ্যের সরবরাহ নিশ্চিত করতে রপ্তানি নিয়ন্ত্রণের পথেও হাঁটছে।

 

বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে বিশ্বজুড়ে নতুন অর্থনৈতিক চাপ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়বে। বাংলাদেশেও নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের ওপর এর প্রভাব আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

 

অর্থনীতি সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এখনই বাজার তদারকি জোরদার, সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং প্রয়োজনীয় পণ্যের পর্যাপ্ত মজুত নিশ্চিত করা না গেলে সামনে খাদ্য ও জ্বালানি খাতে আরও বড় চাপ তৈরি হতে পারে।


সম্পর্কিত নিউজ