{{ news.section.title }}
পাকিস্তানে সেনা অভিযানে নিহত ২২ ভারতপন্থি সশস্ত্র সদস্য
পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশের উত্তর ওয়াজিরিস্তানের শেওয়া এলাকায় নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানে ২২ জন সশস্ত্র ব্যক্তি নিহত হয়েছে বলে দাবি করেছে দেশটির আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর-আইএসপিআর। মঙ্গলবার (১৯ মে) এক বিবৃতিতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী জানায়, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে অস্ত্রধারীদের উপস্থিতি নিশ্চিত হওয়ার পর ১৭ মে থেকে ওই এলাকায় ‘স্যানিটাইজেশন অপারেশন’ শুরু করা হয়।
আইএসপিআরের দাবি, অভিযানের শেষ ২৪ ঘণ্টায় নিরাপত্তা বাহিনী অস্ত্রধারীদের অবস্থান ঘিরে ফেলে। এরপর তীব্র গোলাগুলির একপর্যায়ে ২২ জন নিহত হয়। পাকিস্তান সেনাবাহিনী তাদের “ভারত-সমর্থিত ফিতনা আল-খাওয়ারিজ” হিসেবে উল্লেখ করেছে। তবে এ দাবির পক্ষে স্বাধীন আন্তর্জাতিক যাচাই এখনো পাওয়া যায়নি। ভারত অতীতে পাকিস্তানের এমন অভিযোগ অস্বীকার করে এসেছে।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, নিহতদের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার করা হয়েছে। আইএসপিআরের ভাষ্য অনুযায়ী, তারা ওই অঞ্চলে বিভিন্ন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ছিল। বর্তমানে এলাকাটিতে অভিযান অব্যাহত রয়েছে এবং নিরাপত্তা বাহিনী পুরো এলাকা ঘিরে রেখেছে।
পাকিস্তান সেনাবাহিনী আরও দাবি করেছে, অস্ত্রধারীরা স্থানীয় জনগণকে ভয়ভীতি দেখিয়ে নিজেদের নিরাপদ চলাচলের জন্য ব্যবহার করত। এমনকি নিরাপত্তা বাহিনীর চোখ এড়াতে স্থানীয়দের মানবঢাল হিসেবেও ব্যবহার করা হয়েছে বলে আইএসপিআরের বিবৃতিতে অভিযোগ করা হয়। সেনাবাহিনী এ ধরনের কর্মকাণ্ডকে “অত্যন্ত নিন্দনীয়” বলে উল্লেখ করেছে।
এই অভিযান পরিচালিত হচ্ছে পাকিস্তানের চলমান সন্ত্রাসবিরোধী কর্মসূচি ‘আজম-ই-ইস্তেহকাম’–এর আওতায়। ২০২৪ সালের জুনে পাকিস্তানের শীর্ষ রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্ব এই কর্মসূচি অনুমোদন করে। আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, এই পরিকল্পনার লক্ষ্য ছিল অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা হুমকি মোকাবিলা এবং আফগান সীমান্ত এলাকা দিয়ে সশস্ত্র গোষ্ঠীর অনুপ্রবেশ ঠেকাতে অভিযান জোরদার করা।
পাকিস্তানে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে খাইবার পাখতুনখাওয়া ও বেলুচিস্তান প্রদেশে সশস্ত্র হামলা বেড়েছে। বিশেষ করে ২০২১ সালে আফগানিস্তানে তালেবানের ক্ষমতায় ফেরার পর সীমান্তবর্তী এলাকায় পাকিস্তানি নিরাপত্তা বাহিনী, পুলিশ, সামরিক কনভয় ও সরকারি স্থাপনায় হামলা বৃদ্ধি পেয়েছে বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে। এপি নিউজের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, পাকিস্তান নিয়মিতভাবে এসব হামলার জন্য তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তানসহ বিভিন্ন গোষ্ঠীকে দায়ী করে এবং অনেক সময় তাদের “ফিতনা আল-খাওয়ারিজ” নামে উল্লেখ করে।
ইসলামাবাদের অভিযোগ, আফগান তালেবান সরকার পাকিস্তানবিরোধী গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিচ্ছে না। পাকিস্তানের দাবি, এসব গোষ্ঠী আফগানিস্তানের ভেতরে নিরাপদ আশ্রয় নিয়ে সীমান্ত পেরিয়ে হামলা চালায়। তবে কাবুল বারবার বলেছে, তারা নিজেদের ভূখণ্ড অন্য দেশের বিরুদ্ধে ব্যবহার হতে দেবে না। এই অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ দুই দেশের সম্পর্কে দীর্ঘদিনের উত্তেজনা তৈরি করেছে।
উত্তর ওয়াজিরিস্তান পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের অস্থির সীমান্ত অঞ্চলগুলোর একটি। আফগান সীমান্তঘেঁষা এই এলাকা একসময় তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তানসহ বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত ছিল। পাকিস্তান সেনাবাহিনী অতীতে এখানে একাধিক বড় সামরিক অভিযান চালায়। তবুও পাহাড়ি ভূপ্রকৃতি, সীমান্তের জটিলতা এবং স্থানীয় নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে অঞ্চলটি এখনো উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত।
এ বছরের ফেব্রুয়ারিতেও উত্তর ওয়াজিরিস্তানসহ সীমান্তবর্তী কয়েকটি এলাকায় পাকিস্তান নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানে বহু সশস্ত্র ব্যক্তি নিহত হওয়ার খবর দেয়। এপি নিউজ জানিয়েছিল, পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী তখন উত্তর ওয়াজিরিস্তান, লাক্কি মারওয়াত, বান্নু ও মির আলি এলাকায় অভিযান চালিয়ে ২৬ জনসহ মোট ৩৪ জন সশস্ত্র ব্যক্তিকে হত্যার দাবি করে। একই সময়ে বাজাউরে পুলিশের ওপর হামলায় চারজন পুলিশ সদস্য নিহত হন।
তবে এসব অভিযানের মানবাধিকার ও নিরাপত্তা প্রভাব নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তান সেনাবাহিনীর অভিযান সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সক্ষমতা কমাতে সহায়ক হলেও শুধু সামরিক পদক্ষেপ দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা কঠিন। সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, স্থানীয় জনগণের আস্থা, রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তি, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং আফগানিস্তানের সঙ্গে কার্যকর নিরাপত্তা সমন্বয় ছাড়া উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে সহিংসতা পুরোপুরি কমানো কঠিন হতে পারে।
সব মিলিয়ে উত্তর ওয়াজিরিস্তানের শেওয়া অভিযানে ২২ জন নিহত হওয়ার দাবি পাকিস্তানের চলমান সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। আইএসপিআর এটিকে “বিদেশি মদদপুষ্ট সন্ত্রাসবাদ” নির্মূলে নিরাপত্তা বাহিনীর অঙ্গীকারের অংশ হিসেবে দেখাচ্ছে। তবে নিহতদের পরিচয়, তাদের সংশ্লিষ্টতা এবং ভারতের সম্পৃক্ততার অভিযোগ স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি। ফলে ঘটনাটি যেমন পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সংকটকে সামনে আনছে, তেমনি আফগান সীমান্ত, ভারত-পাকিস্তান উত্তেজনা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার জটিল বাস্তবতাকেও নতুন করে আলোচনায় আনছে।