{{ news.section.title }}
দুই সপ্তাহের মধ্যে সর্বোচ্চে বিশ্ববাজারে তেলের দাম
সংযুক্ত আরব আমিরাতের বারাকাহ পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রাঙ্গণে ড্রোন হামলার পর বিশ্ববাজারে তেলের দাম দুই সপ্তাহের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠেছে। মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য সামরিক পদক্ষেপ, হরমুজ প্রণালিতে নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি স্থাপনায় হামলার আশঙ্কায় বাজারে নতুন করে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সোমবার ব্রেন্ট ক্রুডের দাম বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১১১ দশমিক ২৯ ডলারে পৌঁছায়। দিনের এক পর্যায়ে তা ১১২ ডলার ছুঁয়ে যায়, যা ৫ মে’র পর সর্বোচ্চ। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট বা ডব্লিউটিআই অপরিশোধিত তেলের দাম বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১০৭ দশমিক ৭৩ ডলারে দাঁড়ায়।
তেলের দাম বাড়ার পেছনে প্রধান কারণ হিসেবে বিশ্লেষকরা মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা ঝুঁকিকে দেখছেন। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে সংঘাত নিরসনের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা স্থবির হয়ে পড়ায় বিনিয়োগকারীরা আশঙ্কা করছেন, নতুন করে সামরিক সংঘাত শুরু হলে উপসাগরীয় অঞ্চলের তেল সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হতে পারে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি নিয়ে উত্তেজনা বাজারে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ তেলবাহী জাহাজ চলাচলের অন্যতম পথ হওয়ায় এই রুটে সামান্য অস্থিরতাও আন্তর্জাতিক বাজারে দ্রুত প্রভাব ফেলে।
আমিরাত কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বারাকাহ পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রাঙ্গণে একটি বৈদ্যুতিক জেনারেটরে ড্রোন হামলার পর আগুন লাগে। তবে এতে কোনো হতাহত হয়নি এবং পারমাণবিক বা বিকিরণ নিরাপত্তায় কোনো প্রভাব পড়েনি। আবুধাবি কর্তৃপক্ষ হামলার উৎস তদন্ত করছে। আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থা-আইএইএও পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে।
বারাকাহ কেন্দ্রটি সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাজধানী আবুধাবি থেকে প্রায় ২০০ কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত। এটি আরব বিশ্বের প্রথম বাণিজ্যিক পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। ফলে এই স্থাপনার আশপাশে ড্রোন হামলার ঘটনা শুধু আমিরাত নয়, পুরো উপসাগরীয় নিরাপত্তা কাঠামোর জন্য উদ্বেগ তৈরি করেছে।
এদিকে সৌদি আরব জানিয়েছে, ইরাকের আকাশসীমা থেকে আসা তিনটি ড্রোন ভূপাতিত করা হয়েছে। দেশটি বলেছে, জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে আমিরাতের বারাকাহ হামলা এবং সৌদি আরবের ড্রোন ভূপাতিতের ঘটনা একই আঞ্চলিক উত্তেজনার অংশ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
বাজার বিশ্লেষক টনি সাইকামোর বলেন, উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি ও কৌশলগত স্থাপনায় ড্রোন হামলা বড় ধরনের সতর্কবার্তা। তাঁর মতে, যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েল যদি ইরানের বিরুদ্ধে নতুন হামলা চালায়, তাহলে ইরান বা ইরান-সমর্থিত আঞ্চলিক গোষ্ঠীগুলোর পক্ষ থেকে উপসাগরীয় জ্বালানি অবকাঠামোতে আরও হামলা হতে পারে।
অন্যদিকে মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস জানিয়েছে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মঙ্গলবার হোয়াইট হাউসের সিচুয়েশন রুমে শীর্ষ জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টাদের সঙ্গে বৈঠক করবেন। বৈঠকে ইরান বিষয়ে সম্ভাব্য সামরিক পদক্ষেপের বিকল্প নিয়ে আলোচনা হতে পারে। রয়টার্স জানিয়েছে, অ্যাক্সিওস দুই মার্কিন কর্মকর্তার বরাতে এই তথ্য দিয়েছে, তবে রয়টার্স নিজে তা স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি।
ট্রাম্প সম্প্রতি ইরানকে সতর্ক করে বলেছেন, “সময় ফুরিয়ে আসছে”-এমন ভাষা ব্যবহার করে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন যে কূটনৈতিক আলোচনায় অগ্রগতি না হলে যুক্তরাষ্ট্র আরও কঠোর অবস্থানে যেতে পারে। অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও আলোচনায় অনমনীয় অবস্থান নিয়ে ওয়াশিংটনে উদ্বেগ বাড়ছে।
এই উত্তেজনার প্রভাব শুধু তেলের বাজারে নয়, এশিয়ার শেয়ারবাজারেও পড়েছে। রয়টার্স জানিয়েছে, বারাকাহ হামলা ও ইরান ঘিরে সামরিক উত্তেজনার কারণে সোমবার ভারতসহ এশিয়ার বিভিন্ন বাজারে চাপ তৈরি হয়। ভারতীয় রুপি রেকর্ড নিম্নমুখী অবস্থানে যায় এবং ব্রেন্ট ক্রুড ১১২ ডলারের কাছাকাছি ওঠায় আমদানিনির্ভর অর্থনীতিগুলো নতুন উদ্বেগে পড়ে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রাশিয়ার তেল রপ্তানি–সংক্রান্ত মার্কিন নীতির পরিবর্তন। ট্রাম্প প্রশাসন রাশিয়ার সমুদ্রপথে তেল রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিলের যে ছাড় দিয়েছিল, তা নবায়ন না করায় বৈশ্বিক সরবরাহ সংকোচনের আশঙ্কা আরও বেড়েছে। এর ফলে ভারতসহ রাশিয়ার তেল আমদানিকারক দেশগুলো নতুন জটিলতার মুখে পড়তে পারে এবং বিকল্প উৎসের ওপর চাপ বাড়তে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে তেলের বাজার তিনটি বড় ঝুঁকির মুখে আছে। প্রথমত, ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের সামরিক পদক্ষেপের আশঙ্কা। দ্বিতীয়ত, উপসাগরীয় অঞ্চলের পারমাণবিক ও জ্বালানি অবকাঠামোতে ড্রোন হামলার ঝুঁকি। তৃতীয়ত, রাশিয়ার তেল রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা–সংক্রান্ত অনিশ্চয়তা। এসব কারণে বাজারে সরবরাহ ঝুঁকি বেড়েছে এবং বিনিয়োগকারীরা তেলের দামে নতুন প্রিমিয়াম যোগ করছেন।
সব মিলিয়ে বারাকাহ পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রাঙ্গণে ড্রোন হামলা মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনাকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। যদিও আমিরাত কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, পারমাণবিক নিরাপত্তায় কোনো প্রভাব পড়েনি, তবু এই হামলা উপসাগরীয় অঞ্চলের কৌশলগত স্থাপনাগুলোর ঝুঁকি সামনে এনেছে। ইরান ইস্যুতে ট্রাম্প প্রশাসনের সম্ভাব্য সামরিক আলোচনার খবর এবং হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে অনিশ্চয়তা অব্যাহত থাকলে আগামী দিনগুলোতেও বিশ্ববাজারে তেলের দাম অস্থির থাকতে পারে।
সূত্র : রয়টার্স