{{ news.section.title }}
যুক্তরাষ্ট্র থেকে বছরে ১৭ বিলিয়ন ডলারের কৃষিপণ্য কিনবে চীন
যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে দীর্ঘদিনের বাণিজ্য উত্তেজনার মধ্যেই কৃষিপণ্য আমদানি বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বেইজিং-এমন দাবি করেছে হোয়াইট হাউস।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বেইজিং বৈঠকের পর রোববার প্রকাশিত এক তথ্যপত্রে হোয়াইট হাউস জানায়, ২০২৬, ২০২৭ ও ২০২৮ সালে চীন যুক্তরাষ্ট্র থেকে বছরে অন্তত ১৭ বিলিয়ন ডলারের কৃষিপণ্য কিনবে। ২০২৬ সালের ক্ষেত্রে বছরের অবশিষ্ট সময় বিবেচনায় ক্রয়ের লক্ষ্যমাত্রা আনুপাতিকভাবে নির্ধারণ করা হবে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই কৃষিপণ্য ক্রয়ের প্রতিশ্রুতি গত অক্টোবরের সয়াবিন চুক্তির অতিরিক্ত। অর্থাৎ, ২০২৫ সালের অক্টোবরে ট্রাম্প-শি বৈঠকে চীন যে সয়াবিন কেনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, নতুন কৃষিপণ্য ক্রয়ের অঙ্ক তার বাইরে আলাদা হিসেবে ধরা হচ্ছে। ওই আগের চুক্তি অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষ দুই মাসে চীনের ১ কোটি ২০ লাখ মেট্রিক টন এবং ২০২৬ থেকে ২০২৮ সাল পর্যন্ত প্রতি বছর অন্তত ২ কোটি ৫০ লাখ মেট্রিক টন মার্কিন সয়াবিন কেনার কথা ছিল।
হোয়াইট হাউসের তথ্যপত্রে আরও বলা হয়েছে, চীন মার্কিন গরুর মাংসের বাজারে প্রবেশাধিকার পুনরুদ্ধারে পদক্ষেপ নেবে। মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে যাওয়া ৪০০টির বেশি মার্কিন গরুর মাংস উৎপাদন ও রপ্তানি প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন নবায়ন করা হবে এবং নতুন কিছু প্রতিষ্ঠানও তালিকাভুক্ত করা হবে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগ যেসব অঙ্গরাজ্যকে বার্ড-ফ্লুমুক্ত হিসেবে ঘোষণা করেছে, সেসব অঞ্চল থেকে পোলট্রি আমদানি পুনরায় শুরু করার বিষয়ে চীন কাজ করবে।
চুক্তির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো-দুই দেশ বাণিজ্য ও বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনায় সমন্বয় আনতে নতুন দুটি কাঠামো গঠনে সম্মত হয়েছে। এগুলো হলো ‘ইউএস-চায়না বোর্ড অব ট্রেড’ এবং ‘ইউএস-চায়না বোর্ড অব ইনভেস্টমেন্ট’। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ও দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ–সংক্রান্ত সংস্থা বা বোর্ড গঠনের বিষয়ে সম্মতির কথা জানিয়েছে। তবে এসব বোর্ড ঠিক কীভাবে কাজ করবে, তার পূর্ণ কাঠামো এখনো স্পষ্ট নয়।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর মতে, ট্রাম্পের বেইজিং সফর ছিল উচ্চপর্যায়ের ও কূটনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তবে বৈঠক শেষে দুই দেশের বক্তব্যে কিছু পার্থক্যও দেখা গেছে। আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র বৈঠক শেষে বাণিজ্যিক অগ্রগতিকে বড় অর্জন হিসেবে তুলে ধরলেও, চীনের বিবৃতিতে তাইওয়ানসহ রাজনৈতিক ইস্যুতে সতর্ক বার্তা বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। দুই পক্ষ একে অপরের সব দাবি একইভাবে নিশ্চিত করেনি।
বাণিজ্য যুদ্ধের কারণে গত কয়েক বছরে যুক্তরাষ্ট্র–চীন কৃষিপণ্য বাণিজ্য বড় ধাক্কা খেয়েছে। রয়টার্স জানিয়েছে, ২০২৫ সালে চীনে মার্কিন কৃষিপণ্য রপ্তানি আগের বছরের তুলনায় ৬৫ দশমিক ৭ শতাংশ কমে ৮ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলারে নেমে যায়। বিশেষ করে সয়াবিন খাতে যুক্তরাষ্ট্র বড় বাজার হারায়। ২০১৬ সালে চীনের সয়াবিন আমদানিতে যুক্তরাষ্ট্রের অংশ ছিল ৪১ শতাংশ; ২০২৪ সালে তা কমে দাঁড়ায় ২০ শতাংশে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই নতুন কৃষিপণ্য চুক্তি কার্যকর হলে সবচেয়ে বেশি স্বস্তি পেতে পারেন মার্কিন কৃষকরা। কারণ শুল্কযুদ্ধ ও পাল্টা বাণিজ্যিক চাপের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের সয়াবিন, গরুর মাংস, পোলট্রি, গম ও সরগম রপ্তানি বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছিল। এপি জানিয়েছে, চুক্তির লক্ষ্য হলো মার্কিন কৃষিপণ্যের বাজারে চীনা ক্রেতাদের আবার ফিরিয়ে আনা এবং বাণিজ্য সম্পর্ককে কিছুটা স্থিতিশীল করা।
তবে এই ঘোষণার বাস্তবায়ন নিয়ে সতর্কতা আছে। অতীতে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে বড় অঙ্কের পণ্য কেনার প্রতিশ্রুতি থাকলেও সবসময় তা পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। বিশেষ করে ২০২০ সালের প্রথম পর্যায়ের বাণিজ্য চুক্তির সময়ও চীনের বড় অঙ্কের মার্কিন পণ্য কেনার প্রতিশ্রুতি ছিল, কিন্তু করোনা মহামারি, শুল্কসংঘাত ও রাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছিল। তাই এবারও পর্যবেক্ষকরা বলছেন, শুধু ঘোষণা নয়, আগামী মাসগুলোতে প্রকৃত আমদানি পরিসংখ্যানই চুক্তির সফলতা নির্ধারণ করবে।
বেইজিং বৈঠকে কৃষিপণ্য ছাড়াও অর্থনৈতিক সহযোগিতা, শুল্ক কমানো, বাজারে প্রবেশাধিকার, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সরবরাহ, বিমান শিল্প এবং বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনা নিয়ে আলোচনা হয়। ফিন্যান্সিয়াল টাইমস জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের ভাষ্য অনুযায়ী দুই দেশ বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বোর্ড গঠনে সম্মত হয়েছে, তবে চীনের পক্ষ থেকে সব মার্কিন দাবির সমান বিস্তারিত নিশ্চিতকরণ পাওয়া যায়নি।
আল জাজিরার প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, বৈঠক আড়ম্বরপূর্ণ ও বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশে হলেও বাস্তব চুক্তির সংখ্যা তুলনামূলক সীমিত। দুই নেতা অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়ানোর কথা বললেও তাইওয়ান, ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ এবং নিরাপত্তা ইস্যুর মতো স্পর্শকাতর বিষয়গুলোতে প্রকাশ্য অগ্রগতি খুব বেশি দেখা যায়নি। বৈঠকের আগে শি জিনপিং সতর্ক করেছিলেন, তাইওয়ান ইস্যু সঠিকভাবে সামাল না দিলে দুই দেশের সম্পর্কে সংঘাতের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
দুই দেশের বাণিজ্য সম্পর্ক গত এক দশকে বড় ধরনের ওঠানামার মধ্য দিয়ে গেছে। পাল্টাপাল্টি শুল্ক, প্রযুক্তি নিষেধাজ্ঞা, সরবরাহ শৃঙ্খল নিয়ে দ্বন্দ্ব এবং ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার কারণে ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে। আল জাজিরার তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে দুই দেশের পণ্য বাণিজ্য ছিল ৬৯০ বিলিয়ন ডলারের বেশি; কিন্তু গত বছর তা কমে প্রায় ৪১৫ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়ায়।
সব মিলিয়ে, যুক্তরাষ্ট্র থেকে বছরে অন্তত ১৭ বিলিয়ন ডলারের কৃষিপণ্য কেনার ঘোষণাটি ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য বড় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সাফল্য হিসেবে উপস্থাপিত হচ্ছে। তবে চীনের আনুষ্ঠানিক বিস্তারিত প্রতিক্রিয়া, বাস্তব আমদানি পরিসংখ্যান এবং নতুন বাণিজ্য বোর্ডগুলোর কার্যকারিতা না দেখা পর্যন্ত এই চুক্তির স্থায়িত্ব নিয়ে সংশয় থেকেই যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি যুক্তরাষ্ট্র–চীন সম্পর্কের বরফ গলানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হতে পারে, কিন্তু দুই পরাশক্তির গভীর বাণিজ্য ও ভূরাজনৈতিক দ্বন্দ্ব এখনো পুরোপুরি মিটে যায়নি।
তথ্যসূত্র: আল–জাজিরা