{{ news.section.title }}
আন্তর্জাতিক বাজারে কমল সোনা-রুপার দাম
বিশ্ববাজারে মূল্যস্ফীতি বাড়ার আশঙ্কা, মার্কিন সুদের হার আরও কঠোর হওয়ার পূর্বাভাস এবং ট্রেজারি বন্ডের ইল্ড বৃদ্ধির চাপে আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার দাম বড় ধরনের পতনের মুখে পড়েছে। মঙ্গলবার (১৯ মে) লেনদেনের শুরুতে স্পট গোল্ডের দাম কমে গত দেড় মাসের সর্বনিম্ন স্তরের কাছাকাছি অবস্থান করছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মঙ্গলবার সকাল পর্যন্ত আন্তর্জাতিক বাজারে স্পট গোল্ডের দাম ০.৬ শতাংশ কমে প্রতি আউন্স ৪ হাজার ৫৩৯ দশমিক ৫৪ ডলারে দাঁড়ায়। এর আগে সোমবার দাম নেমে ৪ হাজার ৪৭৯ দশমিক ৫৪ ডলারে পৌঁছায়, যা ৩০ মার্চের পর সর্বনিম্ন। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের জুন ডেলিভারির গোল্ড ফিউচার ০.৩ শতাংশ কমে প্রতি আউন্স ৪ হাজার ৫৪৩ ডলারে নেমেছে।
বাজার বিশ্লেষকেরা বলছেন, পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের অস্থিরতা ও ইরানকে ঘিরে উত্তেজনার কারণে জ্বালানি তেলের দাম দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। এতে বিশ্বজুড়ে নতুন করে মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরি হয়েছে। এই মূল্যস্ফীতি সামাল দিতে মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভ সুদের হার আরও বাড়াতে পারে-এমন ধারণা থেকেই বিনিয়োগকারীরা সোনা বিক্রি বাড়িয়েছেন।
সাধারণত সোনা মূল্যস্ফীতির বিরুদ্ধে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচিত হয়। কিন্তু সুদের হার বাড়লে সোনার আকর্ষণ কমে যায়, কারণ সোনা থেকে কোনো সুদ বা লভ্যাংশ পাওয়া যায় না। বিপরীতে মার্কিন ট্রেজারি বন্ডের ইল্ড বাড়লে বিনিয়োগকারীরা বেশি রিটার্নের আশায় বন্ডের দিকে ঝুঁকতে থাকেন। এ কারণেই উচ্চ সুদের প্রত্যাশা সোনার বাজারে বড় চাপ তৈরি করছে।
রয়টার্স জানিয়েছে, বাজারে এখন ডিসেম্বরের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে সুদের হার বৃদ্ধির সম্ভাবনা প্রায় ৩৮ শতাংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে ১০ বছর মেয়াদি মার্কিন ট্রেজারি ইল্ডও এক বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ের কাছাকাছি অবস্থান করছে। এতে সোনার মতো অলভ্যাংশধারী সম্পদে বিনিয়োগের সুযোগব্যয় বেড়েছে।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠান অ্যাক্টিভট্রেডসের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক রিকার্ডো ইভানজেলিস্তা বলেন, পারস্য উপসাগরের অচলাবস্থা থেকে তৈরি হওয়া মূল্যস্ফীতির আশঙ্কায় ফেডারেল রিজার্ভের কঠোর নীতি গ্রহণের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তার মতে, এই কারণেই নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে পরিচিত সোনার ওপর চাপ বাড়ছে।
তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সংঘাতের গতিপ্রকৃতি বিনিয়োগকারীরা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন। কারণ মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়, তার ওপর নির্ভর করবে জ্বালানি তেলের দাম, মূল্যস্ফীতি এবং শেষ পর্যন্ত ফেডের পরবর্তী মুদ্রানীতির অবস্থান।
এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত হামলা আপাতত স্থগিত করার কথা বলার পর আন্তর্জাতিক তেলের বাজারে কিছুটা স্বস্তি দেখা গেছে। তবে ব্রেন্ট ক্রুড এখনও ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১১০ ডলারের কাছাকাছি অবস্থান করছে, যা বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতির চাপ কমার জন্য যথেষ্ট নয় বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
বাজারে ডলারের শক্তিশালী অবস্থানও সোনার দামে চাপ তৈরি করছে। মার্কিন ডলার শক্তিশালী হলে অন্যান্য মুদ্রায় সোনা কেনা তুলনামূলক ব্যয়বহুল হয়ে পড়ে। মঙ্গলবার ডলার সূচক ০.৩ শতাংশ বেড়ে ৯৯.২৭–এ অবস্থান করছিল।
সোনার পাশাপাশি অন্যান্য মূল্যবান ধাতুর দামও কমেছে। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, স্পট সিলভার ২.৩ শতাংশ কমে প্রতি আউন্স ৭৫.৮৬ ডলারে নেমেছে। প্ল্যাটিনাম ০.৮ শতাংশ কমে ১ হাজার ৯৬৪ দশমিক ৭৪ ডলার এবং প্যালাডিয়াম ১.৯ শতাংশ কমে ১ হাজার ৩৯১ দশমিক ৮৬ ডলারে দাঁড়িয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, মূল্যবান ধাতুর বাজারে সাম্প্রতিক পতন শুধু সোনার একক দুর্বলতার কারণে নয়; বরং পুরো কমোডিটি বাজারই এখন সুদের হার, ডলার, তেল এবং ভূরাজনৈতিক ঝুঁকির জটিল সমীকরণের মধ্যে আছে। মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বাড়লে সাধারণত সোনার নিরাপদ বিনিয়োগ চাহিদা বাড়ে, কিন্তু এবার সেই প্রভাবকে ছাপিয়ে গেছে সুদের হার বৃদ্ধির আশঙ্কা ও ট্রেজারি ইল্ডের চাপ।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক পতনের পরও সোনা গত বছরের তুলনায় অনেক উঁচু দামে অবস্থান করছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে প্রতি আউন্স সোনার দাম ৫ হাজার ৩১৮ ডলারের বেশি ছুঁয়ে রেকর্ড গড়েছিল। সেখান থেকে দাম এখন প্রায় ১৪ শতাংশ কমেছে, তবে বছরওয়ারি হিসাবে এখনও সোনা উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি দামে রয়েছে।
দেশের বাজারেও আন্তর্জাতিক বাজারের ওঠানামার প্রভাব পড়তে পারে। বাংলাদেশে সোনার দাম নির্ধারণ করে বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন বা বাজুস। সাম্প্রতিক বাজুসভিত্তিক লাইভ দামে ২২ ক্যারেট সোনা প্রতি ভরি ২ লাখ ৪৪ হাজার ৭১১ টাকা, ২১ ক্যারেট ২ লাখ ৩৩ হাজার ৫৭২ টাকা, ১৮ ক্যারেট ২ লাখ ২১৩ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির সোনা ১ লাখ ৬৩ হাজার ৬৩ টাকা দেখানো হয়েছে। তবে স্থানীয় বাজারে কেনাবেচার আগে বাজুসের সর্বশেষ বিজ্ঞপ্তি যাচাই করা জরুরি, কারণ দাম যেকোনো দিন পরিবর্তন হতে পারে।
এর আগে ৫ মে বাজুস ২২ ক্যারেট সোনার দাম প্রতি ভরিতে ২ হাজার ১৫৮ টাকা কমিয়ে ২ লাখ ৪০ হাজার ৩৩৭ টাকা নির্ধারণ করেছিল। স্থানীয় বাজারে তেজাবি সোনার দাম কমার কারণ দেখিয়ে ওই দর সমন্বয় করা হয়।
তথ্যসূত্র: রয়টার্স